

স্টাফ রিপোর্টার: ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাতের প্রভাব আরো স্পষ্টভাবে পড়তে শুরু করেছে বৈশ্বিক আর্থিক বাজারে। দুই দেশের মধ্যে নতুন করে উত্তেজনার জেরে ফের বাড়ছে জ্বালানি তেলের দাম। সেই সঙ্গে মূল্যস্ফীতির নতুন আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এর প্রভাবে বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বন্ড বাজার হিসেবে পরিচিত যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বাজারেও অস্থিরতা বেড়েছে। বন্ডের সুদ বেড়ে যাওয়ায় ঋণের খরচও বাড়ছে। এতে শুধু যুক্তরাষ্ট্র নয়, বিশ্ব অর্থনীতিতে ফের নতুন করে চাপের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে বলে এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে সিএনএন। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান যুদ্ধ বন্ধে জুনের মাঝামাঝি সময় একটি প্রাথমিক সমঝোতায় পৌঁছায়। পরে একটি সমঝোতা স্মারকে (এমওইউ) সইও করে দুই দেশ। এতে যুদ্ধবিরতি বজায় রাখা, হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল পুনরায় চালু করা, যুক্তরাষ্ট্রের নৌ-অবরোধ ধাপে ধাপে প্রত্যাহার ও স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠায় ৬০ দিনের মধ্যে আলোচনার পথ তৈরির কথা ছিল। তবে নতুন করে হামলা-পাল্টাহামলা শুরু হওয়ায় সে সমঝোতা কার্যত ভেঙে পড়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, বিনিয়োগকারীরা এখন ধারণা করছেন, মূল্যস্ফীতি ফের বাড়তে পারে। সে কারণে মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ সুদহার দীর্ঘ সময় উঁচু পর্যায়ে রাখতে পারে। এমনকি প্রয়োজনে ফের সুদহার বাড়ানোর সিদ্ধান্তও নিতে পারে ব্যাংকটি। এ প্রত্যাশাই বন্ড বাজারে বড় ধরনের পরিবর্তন আনছে। যুক্তরাষ্ট্রের ১০ বছর মেয়াদি ট্রেজারি বন্ডের সুদ বৃহস্পতিবার বেড়ে ৪ দশমিক ৭১ শতাংশে পৌঁছেছে। এটি ২০২৫ সালের জানুয়ারির পর সর্বোচ্চ। অন্যদিকে ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শুরুর আগে সুদ ৪ শতাংশেরও নিচে নেমে যায়। বন্ডের সুদ বাড়ার অর্থ হলো বন্ডের দাম কমছে এবং বিনিয়োগকারীরা বেশি মুনাফা দাবি করছেন। এদিকে যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দামও বেড়েছে। ব্রেন্ট ক্রুডের দাম একদিনেই ৭ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারে পৌঁছেছে। তেলের দাম বাড়লে পরিবহন, উৎপাদন ও জ্বালানি ব্যয় বেড়ে যায়। ফলে মূল্যস্ফীতি আরো বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। এ আশঙ্কাই বন্ড বাজারে সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলছে। বিশ্বের বৃহত্তম বন্ড বাজারগুলোর একটি হলো যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বাজার। এর আকার প্রায় ৩০ ট্রিলিয়ন ডলার। এ বাজারের ওঠানামা শুধু সরকারি ঋণের খরচ নয়, ব্যবসা-বাণিজ্য, আবাসন খাত ও ভোক্তা ঋণের ওপরও প্রভাব ফেলে। তাই বাজারে অস্থিরতা দেখা দিলে এর প্রভাব বিশ্বজুড়েই অনুভূত হয়। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, চলতি সপ্তাহের নীতিনির্ধারণী বৈঠকে ফেড সুদহার বাড়াতে পারে। একই সঙ্গে বিনিয়োগকারীরা মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি মোকাবেলায় সরকারি বন্ডে আগের চেয়ে বেশি সুদ দাবি করছেন। যুক্তরাষ্ট্রের ১০ বছর মেয়াদি ট্রেজারির সুদ দেশটির অর্থনীতিতে ঋণের ব্যয় নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বিশেষ করে ৩০ বছর মেয়াদি গৃহঋণের সুদ অনেকটাই এর ওপর নির্ভরশীল। বর্তমানে ৩০ বছর মেয়াদি স্থির সুদের গৃহঋণের গড় হার বেড়ে ৬ দশমিক ৫৮ শতাংশে পৌঁছেছে। এটি প্রায় এক বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। ফলে নতুন বাড়ি কেনা বা আবাসন ঋণ নেয়া আরো ব্যয়বহুল হয়ে উঠছে।
এদিকে ফেডের নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে কেভিন ওয়ার্শ দায়িত্ব নেয়ার পর তার নীতিগত অবস্থান নিয়েও বাজারে আলোচনা চলছে। তিনি মে মাসে দীর্ঘদিনের চেয়ারম্যান জেরোম পাওয়েলের স্থলাভিষিক্ত হন। দায়িত্ব নেয়ার পর তিনি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কার্যক্রমে সংস্কারের অঙ্গীকার করেন। বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান বেয়ার্ড স্ট্র্যাটেগাসের স্থির আয় গবেষণা বিভাগের প্রধান টম জিৎসোরিস বলেন, ‘বর্তমানে বন্ড বাজারে সবচেয়ে বড় প্রভাব ফেলছে নতুন ফেড চেয়ারম্যানের নীতিগত অবস্থান নিয়ে বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশা। বাজার এখন বুঝতে চাইছে, তার নেতৃত্বে ফেড ভবিষ্যতে কী ধরনের পদক্ষেপ নেবে। বন্ড বাজারের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজারেও নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। গত বৃহস্পতিবার ডাও জোন্স সূচক প্রায় ১ শতাংশ কমেছে। এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচক কমেছে ১ দশমিক ২ শতাংশ। প্রযুক্তিনির্ভর নাসডাক কম্পোজিট সূচক নেমেছে ২ দশমিক ১৫ শতাংশ।প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর শেয়ারদরেও বড় পতন দেখা গেছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতে ব্যয় বাড়ানোর পরিকল্পনা ঘোষণার পর অ্যালফাবেটের শেয়ার প্রায় ৭ শতাংশ কমেছে। অন্যদিকে প্রত্যাশার চেয়ে কম ত্রৈমাসিক মুনাফা প্রকাশের পর টেসলার শেয়ার ১৪ দশমিক ৫ শতাংশ পড়ে যায়। এক বছরের বেশি সময়ের মধ্যে এটি দুই প্রতিষ্ঠানেরই সবচেয়ে বড় একদিনের পতন সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোয় প্রধান মার্কিন শেয়ার সূচকগুলোও নিম্নমুখী রয়েছে। জুনের শুরুতে সর্বোচ্চ অবস্থানে পৌঁছানোর পর থেকে নাসডাক ৭ শতাংশের বেশি কমেছে। একই সময় এসঅ্যান্ডপি ৫০০ ও ডাও জোন্স উভয় সূচকই প্রায় আড়াই শতাংশ নিচে নেমেছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, ইরান যুদ্ধ ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি শুধু যুক্তরাষ্ট্র নয়, ইউরোপ ও এশিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর নীতিতেও প্রভাব ফেলছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতির আশঙ্কায় বিভিন্ন দেশে সুদহার বেশি সময় ধরে উচ্চ পর্যায়ে থাকতে পারে। এখন বিনিয়োগকারীদের নজর হরমুজ প্রণালি ও লোহিত সাগর অঞ্চলের পরিস্থিতির দিকে। কারণ এসব অঞ্চলে উত্তেজনা বাড়লে তেলের দাম আবারো আকাশচুম্বী হতে পারে। ক্যাপিটাল ইকোনমিকসের জলবায়ু ও পণ্যবাজারবিষয়ক অর্থনীতিবিদ হামাদ হুসেইন বলেন, চলমান সংঘাত কমার স্পষ্ট লক্ষণ দেখা না গেলে তেলের দামের ঊর্ধ্বমুখী ঝুঁকিই বেশি থাকবে।

Posted ১০:২১ পূর্বাহ্ণ | রবিবার, ২৬ জুলাই ২০২৬
দৈনিক গণবার্তা | Gano Barta


